বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সঙ্গীতাঙ্গনে তিনি যেন এক জাদুকর। তার জাদুর স্পর্শে কালজয়ী হয়ে আছে এদেশের অসংখ্য গান।
গতকাল তিনি পরলোকগমন করলেন। প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক এসব পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি। ২৫ মার্চের ঘটনা তিনি নিজ চোখে দেখেছিলেন। এ রাতকে সবাই ‘কালরাত্রি’ বললেও বুলবুল সেই রাতকে ‘লাল রাত’ বলতেন। কারণ, এ রাতে মানুষের রক্তে বাংলার মাটি লাল হয়েছিল। ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে তার বন্ধুরা মিলে সাইকেল চড়ে এসএম হল, জহুরুল হক হল, রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন রাস্তার অলিতে-গলিতে ছুটে গিয়েছিলেন। শত শত মানুষের লাশ আর তাজা রক্তের ছড়াছড়ি দেখে সেদিন আতকে উঠেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদারদের ধ্বংস করতে তখনই যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে আটক হয়ে একসময় পাশবিক ও রোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিয়মিত গান শুরু করেন ১৯৭৬ সাল থেকে। ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে নিজের মেধা আর কর্মগুনে জায়গা করেনে সারা দেশের মানুষের মনে। সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আবদুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনকচাঁপাসহ বাংলাদেশি প্রায় সব জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। সংগীতাঙ্গনে অবদানের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বুলবুল অসংখ্য গানে সুর করেছেন, যার অধিকাংশ গানই তার নিজের রচিত। তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন। বুলবুলের সংগীত পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো-
মরণের পরে, সহযাত্রী, মায়ের অধিকার, চাওয়া থেকে পাওয়া, বিয়ের ফুল, তেজি, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, সৎ ভাই, দায়ী কে, দাঙ্গা, আম্মাজান, আব্বাজান, মুক্তি চাই, প্রেমের তাজমহল, প্রেমের জ্বালা, অন্ধ প্রেম, বর্তমান, মিনিস্টার, ইতিহাস, জ্যোতি, মায়ের সম্মান, অন্যায়ের প্রতিবাদ, অশান্ত আগুন, কষ্ট, রাঙ্গা বউ, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, পড়েনা চোখের পলক, তোমাকে চাই, লুটতরাজ, অবুঝ হৃদয়, মহৎ, তুমি বড় ভাগ্যবতী, হিংসা, লাভ স্টোরি, জ্বলন্ত বিস্ফোরণ, সমাজ কে বদলে দাও, ধর, ফায়ার, কাল নাগিনীর প্রেম, বাঘিনী কন্যা, বন্ধন, মন মানে না, মন, নারীর মন, সাথি তুমি কার, ফুল নেব না অশ্রু নেব, আনন্দ অশ্রু, লক্ষ্মীর সংসার, আমার অন্তরে তুমি, মহা মিলন, দুই নয়নের আলো।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে আছে-
সব’কটা জানালা খুলে দাও না, মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে, সেই রেল লাইনের ধারে, সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য, ও আমার আট কোটি ফুল, মাগো আর তোমাকে, ঘুম পাড়ানি মাসি, একতারা লাগেনা আমার দোতারাও লাগে না, আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যেখানে, আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন, আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি, ও আমার মন কান্দে ও আমার প্রাণ কান্দে, আইলো দারুণ ফাগুনরে, আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো, আমার গরুর গাড়িতে বৌ সাজিয়ে, পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি, তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়, ওই চাঁদ মুখে যেন লাগে না গ্রহণ, কত মানুষ ভবের বাজারে, বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম, আম্মাজান আম্মাজান, স্বামী আর স্ত্রী বানায় যে জন মিস্ত্রি, ঈশ্বর আল্লাহ্ বিধাতা জানে, এই বুকে বইছে যমুনা, প্রেম কখনো মধুর, কখনো সে বেদনা বিঁধুর, পড়ে না চোখের পলক, যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে, কী আমার পরিচয় ঠিকানা কী জানি না, অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে, তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন, তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়, তুমি হাজার ফুলের মাঝে একটি গোলাপ , জীবনে বসন্ত এসেছে, ফুলে ফুলে ভরে গেছে মন, আমার হৃদয় একটা আয়না, বিধি তুমি বলে দাও আমি কার, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, হৃদয়ে সুখের দোলা, তুমি আমার এমনই একজন, একাত্তরের মা জননী, জীবন ফুরিয়ে যাবে ভালবাসা ফুরাবে না জীবনে, অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন, ওগো সাথি আমার তুমি কেন চলে যাও, তুমি সুঁতোয় বেঁধেছ শাপলার ফুল নাকি তোমার মন, একদিন দুই দিন তিন দিন পর, গানে গানে চেনা হলোসহ আরও অসংখ্য গান।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সংগীতবিষয়ক একটি বই লিখে অবসর সময়টা পার করছিলেন। বইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘সার্কল অব সিক্সটিন্থ’। বইটি তিনটি খ-ে প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল বুলবুলের। এটি একটি গবেষণাধর্মী বই। তাই লিখতে একটু সময় লাগছিল তার। বইটির প্রথম খ-ে ৬২৫ পৃষ্ঠা, দ্বিতীয় খ-ে ৩০০ আর শেষ খ-ে ৩৫০ পৃষ্ঠা। প্রায় সাড়ে আট বছরের পরিশ্রমের ফসল তার এই বইটি। সংগীত অঙ্গনকে বইটি উপহার দিতে চেয়েছিলেন বুলবুল। কিন্তু সেটি আর নিজের মতো করে প্রকাশ করে যেতে পারলেন না।

Comments
Post a Comment